স্ত্রী নির্যাতনে বিশ্বে চতুর্থ বাংলাদেশ : বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা

 

‘করোনাকালে নারী নেতৃত্ব, গড়বে নতুন সমতার বিশ্ব’- এ স্লোগান নিয়ে গত ৮ মার্চ বাংলাদেশে পালিত হয়েছে আন্তর্জাতিক নারী দিবস। বিশ্বজুড়ে সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন, পুঁজিবাদের শোষণের কারণে নারীর অবস্থান যখন ক্রমশ নাজুক ও প্রান্তিক অবস্থানমুখী হচ্ছে তখন নারীর উত্তরণের পথে এবারের নারী দিবসে জাতিসংঘ আন্তর্জাতিকভাবে এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য করেছিল- ‘নারী নেতৃত্বের বিকাশ : সমতাপূর্ণ ভবিষ্যৎ গড়ার অঙ্গীকার’। তবে সার্বিকভাবে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে, সময়-সভ্যতার যতই অগ্রগতি হোক, নারীর মুক্তি কি আদৌ এসেছে? নারী কি পেরেছে তার শৃঙ্খল ছিন্ন করতে?

বিশ্বের যেসব দেশে স্বামী বা সঙ্গীর হাতে নারী সবচেয়ে বেশি নির্যাতিত ও নিপীড়িত, সেসব দেশের তালিকায় উঠে এসেছে বাংলাদেশের নাম।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, দেশের ১৫ থেকে ৪৯ বছর বয়সী নারীদের ৫০ শতাংশই জীবনে কখনও না কখনও স্বামী বা পুরুষ সঙ্গীর হাতে শারীরিক ও যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।

সংস্থাটি বিশ্বের ১৬১টি দেশ ও অঞ্চলে ২০০০ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত নারী নির্যাতনের তথ্য বিশ্লেষণ করে এ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। ডব্লিউএইচও তথ্যমতে, বিশ্বে প্রতি তিনজন নারীর একজন জীবদ্দশায় নির্যাতনের শিকার হন।

প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপদেশ কিরিবাতিতে স্বামী বা সঙ্গীর হাতে নারী নির্যাতনের হার সবচেয়ে বেশি। অর্থনৈতিকভাবে দরিদ্র ও অনুন্নত এই দেশটিতে ৫৩ শতাংশ নারীই এ ধরনের নির্যাতনের শিকার হন। এরপরই রয়েছে প্রশান্ত মহাসাগরীয় আরও দুটি দ্বীপদেশ ফিজিতে ৫২ শতাংশ ও পাপুয়া নিউগিনিতে ৫১ শতাংশ নারী নির্যাতনের শিকার হন। বাংলাদেশ ও সলোমন দ্বীপপুঞ্জে সমান হারে ৫০ শতাংশ নারী নির্যাতনের শিকার হন। এছাড়া কঙ্গো ও ভানুয়াতুতে সমান হারে ৪৭ শতাংশ নারীকে এ নির্যাতন সইতে হয়।

বাংলাদেশে নারীর ক্ষমতায়নের পথে অন্তরায় হিসেবে কাজ করা বাল্যবিবাহ নিয়ে সম্প্রতি উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জাতিসংঘের শিশু তহবিল ইউনিসেফ। গেল সোমবার (০৮ মার্চ) তাদের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে বাল্যবিবাহের ব্যাপকতা বিশ্বে চতুর্থ সর্বোচ্চ। করোনা মহামারি মেয়েদের বাল্যবিয়ের ক্রমবর্ধমান ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।

নারী নির্যাতনে বাংলাদেশ ছাড়াও দক্ষিণ এশিয়ার আরেক দেশ আফগানিস্তান আছে ষষ্ঠ স্থানে।

গেল ৯ মার্চ জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থার পক্ষে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা প্রকাশিত এ প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ২০১৩ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সমীক্ষায় নারী নির্যাতনের যে চিত্র উঠে এসেছিল, ৭ বছর পরও সেই অবস্থার তেমন উন্নতি হয়নি। ঘনিষ্ঠ কিংবা পরিচিত নয়, এমন ব্যক্তিদের দ্বারাও নারীরা শারীরিক ও যৌন নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। অল্প বয়স থেকেই তাদের ওপর নির্যাতন শুরু হয়।

ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৫ থেকে ৪৯ বছর বয়সী নারীদের মধ্যে স্বামী বা সঙ্গীর হাতে নির্যাতন সবচেয়ে কম (১০ থেকে ১৪ শতাংশ) ঘটেছে ১২টি দেশ ও দুটি অঞ্চলে। এরমধ্যে রয়েছে ইউরোপের ৬টি দেশ, পশ্চিম এশিয়ার ৩টি দেশ এবং কিউবা (১৪ শতাংশ), ফিলিপাইন (১৪ শতাংশ) এবং সিঙ্গাপুর (১১ শতাংশ)।

ডব্লিউএইচও’র প্রতিবেদনে করোনাকালে বাংলাদেশে সবশেষ ১২ মাসে স্বামী বা সঙ্গীর হাতে নারীর শারীরিক বা যৌন নির্যাতনের চিত্রও তুলে ধরা হয়েছে। এ তালিকায় বিশ্বে ১৬ততম অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। করোনাকালে দেশে ২৩ শতাংশ নারী নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। করোনাকালে সবচেয়ে বেশি নারী নির্যাতন হয়েছে আফ্রিকার দেশ ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গোতে (৩৬ শতাংশ)। এছাড়া একই সময়ে আফগানিস্তানে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৩৫ শতাংশ ও পাপুয়া নিউগিনিতে তৃতীয় সর্বোচ্চ ৩১ শতাংশ নারী নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।

করোনাকালীন সবচেয়ে কম, ৪ শতাংশ পর্যন্ত নারী নির্যাতনের ঘটনা নিয়ে তালিকায় শেষের দিকে আছে ৩০টি দেশ ও একটি অঞ্চল। যার মধ্যে ২৪টি দেশ উচ্চ আয়ের। ৩০টি দেশের মধ্যে ২৩টি দেশই ইউরোপেরর। বাকি ৮টি অস্ট্রেলিয়া, জাপান, নিউজিল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, শ্রীলঙ্কা, উরুগুয়ে, কানাডা ও হংকং। শেষের দুটি দেশে নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে মাত্র ৩ শতাংশ, বাকিগুলোতে ৪ শতাংশ করে।

ডব্লিউএইচও বলছে, বিশ্বে মোট নির্যাতনের শিকার নারীদের মধ্যে মাত্র ৬ শতাংশ নির্যাতনের বিষয়ে অভিযোগ করেন। পারিবারিক ও সামাজিক সম্মানের ভয়ে বেশিরভাগই চুপ থাকেন। আর তাই নির্যাতনের প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

 

 

আপনার মতামত প্রদান করুন
  • 4
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
এ বিভাগের অন্যান্য