সমাজ পরিবর্তনে বিশ্ব নেতৃত্বে নারী: সমতা ও ক্ষমতার উত্তরণ

 

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর সুবিখ্যাত ‘মানসী’ কবিতার শুরুতেই নারী সম্পর্কে বলেছেন- “শুধু বিধাতার সৃষ্টি নহ তুমি নারী–/ পুরুষ গড়েছে তোরে সৌন্দর্য সঞ্চারি/ আপন অন্তর হতে।” আবার কবিতার শেষ দুই লাইনে বলেছেন- “পড়েছে তোমার ‘পরে প্রদীপ্ত বাসনা–/ অর্ধেক মানবী তুমি অর্ধেক কল্পনা।” অপরদিকে নারীর মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর ‘নারী’ কবিতায় সাফ বলে দিয়েছেন- “বিশ্বের যা কিছু মহান সৃষ্টি চির কল্যাণকর/ অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।”

গোটা বিশ্বজুড়ে মুক্ত বাজার অর্থনীতি ও পুঁজিবাদের যখন রমরমা অবস্থা, ঠিক এমন সময় অসংখ্য অসংগতির মধ্যে সমাজে পুরুষের পাশাপাশি নারীর ভূমিকা বেশ লক্ষ্যণীয়। এমনকি বাংলাদেশেও সেই ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন, মুক্তিসংগ্রাম কিংবা পরবর্তী প্রায় সকল আন্দোলন-সংগ্রামে নারীর ভূমিকা ছিল অগ্রগণ্য।

সারা বিশ্বেই হাজারো অসংগতির মধ্যেও পুরুষের পাশাপাশি সমাজ পরিবর্তনে ভূমিকা রেখে চলেছেন নারীরা। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। দেশ স্বাধীন হওয়ার আগে থেকে এ পর্যন্ত যত আন্দোলন-সংগ্রাম হয়েছে, সবখানেই নারীর সরব নেতৃত্ব রয়েছে। যদিও তাদের নেতৃত্বের পথটি কোনোকালেই সুগম ছিল না; তবু তারা কোনো আন্দোলন-সংগ্রামে পিছিয়ে থাকেননি। কিন্তু ইতিহাসের কথা স্মরণ করে নজরুল তাঁর সেই ‘নারী’ কবিতায় লিখেছিলেন- ‘কোন রণে কত খুন দিল নর, লেখা আছে ইতিহাসে/ কত নারী দিল সিঁথির সিদুর, লেখা নাই তার পাশে।” অর্থাৎ যুগে যুগে ইতিহাসে নারীর স্থান, ভূমিকা ও জয়গান পুরুষের তুলনায় অপেক্ষাকৃত অনেকটাই কম।

বৈশ্বিক মহামারি নভেল করোনা ভাইরাস মোকাবিলায় বিশেষ অবদান রেখেছে নারী নেতৃত্ব। যে দেশের নেতৃত্ব যত দক্ষ ও জোরালো ছিল, সে দেশ তত সহজে মহামারি মোকাবিলা করতে পেরেছে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ ছাড়াও জার্মানি, ফিনল্যান্ড, আইসল্যান্ড, নিউজিল্যান্ড ও তাইওয়ানের মতো নারী নেতৃত্বাধীন দেশগুলো অবিশ্বাস্য সফলতা দেখিয়েছে। করোনা মোকাবিলায় এই সফল নারী নেত্রীদের নিয়েই এবার প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বিখ্যাত প্রকাশনা সংস্থা ফোর্বস ম্যাগাজিন।

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী, জাতীয় সংসদের স্পিকার, দুই বিরোধী দলীয় নেত্রী এমনকি শিক্ষামন্ত্রী হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছে নারী। ফোর্বসের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, নারীদের সামগ্রিক ক্ষমতায়নে ১৪৯ দেশের মধ্যে পঞ্চম এবং রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে সপ্তম স্থানে রয়েছে বাংলাদেশ।

নতুন ভবিষ্যত সৃষ্টির প্রত্যাশায় সারা দেশ তৃণমূল পর্যায় থেকে নারী নেতৃত্ব গড়ে তুলতে হবে জানিয়ে নারী নেত্রীরা বলেছেন, নেতৃত্বের গুণে এগিয়ে যায় সমাজ। সৎ ও দক্ষ নেতৃত্বের গুণে কুসংস্কার ও সামাজিক অনাচারকে পেছনে ফেলে এগিয়ে যেতে পারে রাষ্ট্র। আর নেতৃত্ব বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে পরিবার, সমাজ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো।

তাঁরা বলেন, সমাজে যিনি নেতৃত্বা দেবেন, তার প্রভাবিক করার ক্ষমতা থাকতে হবে। তাকে বুদ্ধিমান, আত্মবিশ্বাসী, মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন হতে হবে। দেশে-বিদেশে এ নেতৃত্বকে গুরুত্ব দিয়ে এ বছর আন্তর্জাতিক নারী দিবস-২০২১ উদযাপন হচ্ছে।

এ বছর জাতিসংঘ আন্তর্জাতিকভাবে নারী দিবসের প্রতিপাদ্য ঘোষণা করেছে- ‘নারী নেতৃত্বের বিকাশ : সমতাপূর্ণ ভবিষ্যৎ গড়ার অঙ্গীকার’।

১৮৫৭ সালের ৮ মার্চ মজুরি-বৈষম্য, কর্মঘণ্টা নির্ধারণ এবং কর্মক্ষেত্রে বৈরী পরিবেশের প্রতিবাদ করেন যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের সুতা কারখানার একদল শ্রমজীবী নারী। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে তাদের উপর দমন-পীড়ন চালায় মালিকপক্ষ। নানা ঘটনার পর ১৯০৮ সালে জার্মান সমাজতান্ত্রিক নেত্রী ও রাজনীতিবিদ ক্লারা জেটকিনের নেতৃত্বে প্রথম নারী সম্মেলন করা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৭৫ সাল থেকে জাতিসংঘ দিনটি নারী দিবস হিসেবে পালন করছে।

 

আপনার মতামত প্রদান করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
এ বিভাগের অন্যান্য