বিয়ে করে লন্ডনে পাড়ি জমানোর পর বুশরার সাজানো নাটক!

 

শুধুমাত্র লন্ডনে যেতেই বিয়ের নাটক মঞ্চায়ন করেন বুশরা ও তার পরিবার। বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত যুক্তরাজ্যের নাগরিক শাবেদ আলীকে বিয়ে করে যুক্তরাজ্যে পাড়ি জমান বুশরা। সেখানে গিয়ে সংসার করা তো দূরের কথা, মাত্র ২০ দিনের মাথায় ধর্ষণ, নির্যাতন ও হত্যাচেষ্টা সহ নানা অভিযোগ তুলে স্বামীকে পুলিশ ডেকে ধরিয়ে দিয়েছেন স্ত্রী বুশরা বেগম। শুধু তাই নয়। পারিবারিকভাবে শত শত অতিথির উপস্থিতিতে শাবেদ আলী বিয়ে করেছিলেন। কিন্তু স্ত্রী ব্রিটিশ পুলিশের কাছে দাবি করেছেন পরিবার তাঁকে যুক্তরাজ্য প্রবাসী শাবেদ আলীর কাছে বিক্রি করেছে।

জানা যায়, শাবেদ আলীর জন্ম ১৯৮৯ সালে টাওয়ার হ্যামলেটসে। বেড়ে উঠা ও বর্তমান বসবাস ব্রাডফোর্ডে। বাংলাদেশের আদিবাড়ি সিলেটের বালাগঞ্জের বোয়ালজুর বাজার এলাকার খারমাপুর গ্রামে। বাবা আবু বকর আলী। শাবেদ আলী আজডা কমিউনিকেশন্স-এ সিসিটিভি মনিটরিংয়ের কাজ করেন।

বুশরা বেগমের বাড়ি বোয়ালজুর বাজার এলাকার গহরপুর গ্রামে। তাঁর বাবার নাম আব্দুল মতিন। জন্ম ১৯৯৬ সালে। শাবেদ আলী পরিবারের সবাই যুক্তরাজ্যে থাকেন।

৩১ বছরের জীবনে শাবেদ আলী বাংলাদেশে আসেন মাত্র দুবার। প্রথমবার ২০০২ সালে বড় ভাইয়ের বিয়েতে। তখন বয়স ছিলো ১২। পরের বার গেছেন নিজে বিয়ে করতে। ২০১৯ সালের ৫ জুলাই।

শাবেদ আলী বলেন, বুশরা পারিবারিকভাবে পরিচিত। বড় ভাবির চাচাত বোন। বেশ ধুমধাম করে বিয়ে হয় ৫ আগস্ট ২০১৯। গায়ে হলুদ, বিয়ে, বৌ ভাত মিলে তিন দিনের অনুষ্ঠানে হাজারের বেশি অতিথি ছিলেন সেই বিয়েতে। বিয়ের পর দেশে স্ত্রীর সঙ্গে ১৩ দিন ছিলেন। স্ত্রীর সঙ্গে বেশ আনন্দঘন, সুন্দর সময় কাটিয়েছেন। যুক্তরাজ্যে এসে ইংরেজি কোর্স করে, ড্রাইভিং শিখে ভাল ক্যারিয়ার গড়ার আগ্রহের কথা স্বামীকে জানিয়েছেন স্ত্রী বুশরা। স্ত্রীর এমন আগ্রহে তিনি বেশ খুশি হয়েছিলেন।

শাবেদ আলী বলেন, মাত্র তিন মাসের মাথায় ২০২০ সালের ৭ জানুয়ারি স্ত্রী বুশরাকে স্পউস ভিসায় লন্ডনে নিয়ে আসেন। কিন্তু এয়ারপোর্ট থেকে ঘরে পৌছানোর পর আবিষ্কার করেন স্ত্রীর নতুন রূপ।

শাবেদ আলী বলেন, ‘যুক্তরাজ্যে আসার প্রথম দিনই বুশরা ছাপ জানিয়ে দেয় ৫ বছর পর্যন্ত তিনি কোনো সন্তান চায় না। কোনো শারীরিক সম্পর্কও চায় না। আমি যেন তার কাছ থেকে দূরে থাকি।’

‘৫ বছর পর্যন্ত সন্তান না চাওয়ার বিষয়ে আমার কোনো আপত্তি ছিলো না। কিন্তু একঘরে থেকেও আমাকে তার থেকে দূরে থাকতে হবে-এটা কেমন কথা? অথচ বিয়ের পর বাংলাদেশে আমরা ১৩ দিন একসঙ্গে থেকেছি’। বলে চলেন শাবেদ আলী।

বিষয়টি নিয়ে পরদিন-ই এক ইমামের কাছে পরামর্শের জন্য যান শাবেদ আলী। ইমাম তাকে ইসলামিক নিয়ম ও হাদিসের উধ্বৃতি দিয়ে ঠান্ডা মাথায় স্ত্রীকে বুঝানোর পরামর্শ দেন। এতে কাজ না হলে ইমামের পরামর্শে পরদিন আবার পরিবারের মুরব্বিদের বিষয়টি জানান এবং স্ত্রীর সঙ্গে কথা বলার অনুরোধ করেন।
শাবেদ আলী বলেন, পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে আলাপে বুশরা বেগম দুই মাসের সময় চান। বলেন, অন্তত দুই মাস তিনি আমার কাছ থেকে দূরে থাকতে চান। শাবেদ আলীর দাবি ঝামেলা বড় না করতে তিনি সেটি মেনে নেন।

এরপর বিষয়টি নিয়ে কেউ আর কথা বলেনি জানিয়ে শাবেদ আলী বলেন, ২৭ জানুয়ারি ২০২০, অর্থ্যাৎ যুক্তরাজ্যে আসার মাত্র ২০ দিনের মাথায় বুশরা পুলিশে কল করে বসে। পুলিশ এসে শাবেদ আলীকে নিয়ে যায়। বুশরাও পুলিশের সহায়তায় চলে যান নিরাপদ স্থানে।

৯ ঘন্টা কাস্টোডিতে ছিলেন শাবেদ আলী। তারপর ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যনন্ত বেইলে ছাড়া পান। এর মধ্যে অভিযোগের সত্যতা না পাওয়ায় পুলিশ তাকে অভিযোগ থেকে খালাস দেয়।

শাবেদ আলী দাবি করেন, শুরু থেকেই তিনি মাথা ঠান্ডা রেখে ইসলামিক উপায়ে বিষয়টি মোকাবিলার চেষ্টা করেছেন। অভিযোগ থেকে মুক্তি পাওয়ার পর তিনি দ্রুততম সময়ে স্ত্রীকে ডিভোর্স দেয়ার উদ্যোগ নেন। ২০২০ সালের মার্চের ৯ তারিখ ডিভোর্স প্রক্রিয়া শুরু করেন। ওই বছরের ১৭ জুন ডিভোর্স কার্যকর হয়।

এরপর শাবেদ আলী ফ্রিডম অব ইনফরমেশনের অধীনে তাঁর ও বুশরার ঘটনা সম্পর্কে সকল পুলিশ রিপোর্ট সংগ্রহ করেন। ওভাবেই বেরিয়ে আসে পুলিশের কাছে বুশরার বিবৃতির তথ্য- যেখানে পরিবার তাকে তিনি বিক্রি করেছে বলে দাবি করেছেন। ২০২০ সালের ৩১ জানুয়ারি পুলিশকে ওই জবানবন্দি দেন বুশরা।

শাবেদ আলী বলেন, বুশরা আমার ভাবির কাজিন। যদিও বিয়ের আগে তাঁর সঙ্গে আমার কোনো জানা শোনা ছিলো না। পারিবারিক সিদ্ধান্তে, সামাজিক আনুষ্ঠানিকতা ও ধর্মীয় নিয়ম মেনে আমাদের বিয়ে হয়েছে। তাঁকে স্পাউস ভিসায় যুক্তরাজ্যে আনতে বিয়ের সকল প্রমাণ-পত্র হোম অফিসে দিতে হয়েছে। অথচ সে দাবি করেছে, তার পরিবার তাকে বিক্রি করেছে।

শাবেদ আলী বলেন, পুরো ঘটনা থেকে তাঁর মনে হয়েছে, বুশরা বেগম যুক্তরাজ্যে পাড়ি দেয়ার জন্যই তাঁকে বিয়ে করেছিলেন। অন্য কেউ যাতে এমন ঘটনার শিকার না হন সেজন্য ভালভাবে খোঁজ খবর নিয়ে বিয়ে করা উচিত বলে মনে করেন শাবেদ আলী। তিনি বলেন, মানুষকে সতর্ক করার জন্যই নিজের অভিজ্ঞতার কথা প্রকাশ করছেন তিনি।

ওয়েস্ট ইয়র্কশায়ার পুলিশের এক রিপোর্ট এ (অকারেন্স রেফারেন্স-১৩২০০০৫৩৫৮৭) বলা হয়েছে, ‘ভুক্তভোগীকে পরিবার বাংলাদেশে যাওয়া এক পুরুষের কাছে অর্থের বিনিময়ে বিক্রি করেছে এবং যুক্তরাজ্যে ফেরার আগে ওই পুরুষ তাঁকে বিয়ে করে। যুক্তরাজ্যে ওই পুরুষের বাসায় আসা মাত্রই ভুক্তভোগীকে ধর্ষণ করা হয় এবং মেটাল রড দিয়ে পিটানো হয়।’

অবশ্য পুলিশ শাবেদ আলীর বিরুদ্ধে ধর্ষণ, নির্যাতন কিংবা হত্যাচেষ্টার অভিযোগের কোনো সত্যতা পায়নি। তিনি খালাস পেয়েছেন।

শাবেদ আলী বলেন, ঘটনার পর থেকে তাঁর মাথায় দুটি প্রশ্ন বেশ ঘুরপাক ঘাচ্ছিলো- যুক্তরাজ্যে আসার মাত্র ২০ দিনের মাথায় স্ত্রী মিথ্যা অভিযোগ করে তাঁকে পুলিশে দেয়ার কারণ কি? এমন বুদ্ধি বা সাহস-ই বা সে কোথা থেকে পেল? আনুষ্ঠানিক ছাড়াছাড়ি হওয়ার পর বাংলাদেশ থেকে বুশরার আরেক বান্ধবি-ই নিজ উদ্যোগে শাবেদ আলীর সাথে যোগাযোগ করে খোলসা করেছেন আসল ঘটনা। সেই ঘটনায় যাওয়ার আগে জেনে নেয়া যাক এই বিয়ের গল্প।

শাবেদ আলী বলেন, বিষয়টি আমি ভুলে যেতে চেয়েছিলাম। কিন্তু বাংলাদেশ থেকে জুই আক্তার নামে এক মেয়ে ম্যাসেঞ্জারে আমার সাথে যোগাযোগ করে। সে জানায় হোসাইন মোহাম্মদ জনি নামে এক ছেলের সঙ্গে বুশরার বেশ আগ থেকেই প্রেম ছিলো। আমার সঙ্গে বিয়ের পরও সেই সম্পর্ক অব্যাহত থাকে। আমার বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ এনে পুলিশকে রিপোর্ট করতে পারলে, বিয়েও ভেঙ্গে যাবে আবার যুক্তরাজ্যে দ্রুত স্থায়ী বসবাসের ব্যবস্থাও হয়ে যাবে-এমন পরিকল্পনা নিয়েই বুশরা সবকিছু করেছে বলে দাবি ওই জুই আক্তারের। যাতে অ্যাসাইলাম ক্লেইম করলে তাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠাতে না পারে ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ।

শাবেদ আলী জানান, তিনি কেবল জুই আক্তারের কথায় বিশ্বাস করতে চাননি। যে কারণে বুশরার সঙ্গে হোসাইনের সম্পর্কের নানা ছবি, ভিডিও এবং ফেসবুকের নানাকিছু প্রমাণ হিসেবে হাজির করেন জুই।

শাবেদ আলী বলেন, পুলিশের কাছে বুশরার বক্তব্য এবং জুইয়ের কাছ থেকে নানা প্রমাণ পাওযার পর আমার মনে হয়েছে, কেবল যুক্তরাজ্যে আসার জন্য আমাকে বিয়ে করেছিলো বুশরা।

শাবেদ আলী বলেন, জুই আক্তার আরও জানিয়েছেন বুশরার আরেক বান্ধবী আগেই এমন বিয়ে করে বিলেতে এসে স্বামীকে ছেড়ে দিয়েছে। পরে এসাইলাম নিয়ে যুক্তরাজ্যে বসবাস নিশ্চিত হওয়ার পর দেশ থেকে প্রেমিককে নিয়ে আসে। ওই বান্ধবীর সঙ্গে পরিকল্পনা করেই বুশরা সবকিছু করেছে বলে দাবি জুই আক্তারের।

শাবেদ আলী বলেন, জুই আক্তার এক পর্যায়ে তাঁকে বিয়ে করার প্রস্তাব দেয়। তখন তিনি ফেসবুক ঘেটে দেখেন জুই আক্তার, বুশরা এবং হোসাইন সবাই পূর্ব পরিচিত। শাবেদের সন্দেহ- তাঁর মন জয় করার জন্যই জুই এতদিন সব তথ্য নিজ থেকে শেয়ার করেছে। আসলে জুইও হয়তো কেবল যুক্তরাজ্যে আসার জন্য তাকে বিয়ে করতে চেয়েছে।

জুই আক্তারের পাঠানো বুশরার সঙ্গে হোসাইনের ছবি এবং শাবেদ আলীর ফেসবুক ম্যাসেঞ্জারে যোগাযোগের স্ক্রিণশটগুলো পত্রিকার কাছে রয়েছে। এক ফেসবুক আলোচনায় দেখা যায়, একজনের প্রশ্নের জবাবে হোসাইন এমডি জানান, ‘বুশরা ইজ মাই গার্ল ফ্রেন্ড’।

শাবেদ আলী বলেন, এখন আমি বুঝতে পারি বাংলাদেশে থাকতেই বুশরা কেন ইংরেজি শিখবে, ড্রাইভিং শিখবে বলেছে। কারণ সে আমার সঙ্গে সংসার করতে নয়, ভিন্ন লক্ষ্য নিয়ে এ দেশে এসেছে।

শাবেদ আলী বলেন, ২৭ জানুয়ারি বাসা ছেড়ে চলে যাওয়ার পর বুশরার সঙ্গে তাঁর আর যোগাযোগ হয়নি। ঘটার পর ২৮ ফেব্রুয়ারি বেইল কন্ডিশন পার হলে তিনি বাংলাদেশে বুশরার পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। কিন্তু বুশরার পরিবার বলেছে, তাদের মেয়ে এমন কাজ করতেই পারে না। বিষয়টি নিয়ে তারা কথা বলতেও আগ্রহী নয়।

শাবেদ আলী বলেন, আমি তিন মাসের অধিক সময় ডিপ্রেশনে ছিলাম। আমি ন্যায়বিচারও পাইনি। আমার সঙ্গে এটা বিয়ে ছিলো না। এটা ছিলো প্রতারণা-স্ক্যাম। আমার ভাবীর কাজিন হওয়ার কারণে আমরা কোনো খোঁজ-খবর করিনি। বিশ্বাস করেছি। এ কারণেই চরম থোকা খেয়েছি।

 

আপনার মতামত প্রদান করুন
  • 1
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
এ বিভাগের অন্যান্য