পুলিশি নির্যাতনে রায়হানের মৃত্যুর সত্যতা মিলেছে সিসিটিভি ফুটেজে

জকিগঞ্জ টাইমস : সিলেটের বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়িতে তিন ঘণ্টা ১০ মিনিট ৪০ সেকেন্ড অবস্থানকালেই পুলিশি নির্যাতনে মৃত্যু হয় রায়হান উদ্দিন আহমদের। এসএমপি গঠিত তদন্ত কমিটির প্রাথমিক তদন্তে এমন তথ্য বেরিয়ে এসেছে বলে জানিয়েছেন তদন্ত কমিটির প্রধান উপকমিশনার আজবাহার আলী শেখ।

বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়ির পাশে এসপির কার্যালয়ের সিসিটিভি ফুটেজ দেখে বাধ্য হয়েই স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দেন ফাঁড়ির ছয় পুলিশ। এছাড়াও তাদের বর্ণনার সঙ্গে প্রত্যক্ষদর্শীদের তথ্য মিলে যাওয়ায় প্রাথমিকভাবে নির্যাতনের বিষয়ে নিশ্চিত হয় তদন্ত কমিটি।

আজবাহার আলী শেখ বলেন, সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজে দেখা যায়, শনিবার (১০ অক্টোবর) রাত ৩টা ৯ মিনিট ২০ সেকেন্ডে দুটি সিএনজি এসে থামে বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়ির সামনে। পরে ওই সিএনজি থেকে তিনজন পুলিশের সঙ্গে হাতকড়া পরা অবস্থায় নামেন রায়হান। এসময় স্বাভাবিকভাবেই হেঁটে ফাঁড়ির ভেতরে নেয়া হয় রায়হানকে। পরদিন রোববার (১১ অক্টোবর) ভোর ৬টা ২০ মিনিটে দুই পুলিশের ঘাড়ে ভর দিয়ে রায়হানকে মুমূর্ষু অবস্থায় একটি সিএনজিতে তোলা হয়। এরপরই সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তার মরদেহের সন্ধান পায় পরিবার।

শনিবার (১০ অক্টোবর) রাত ২টা ৩৮ মিনিটে নগরীর কাষ্টঘর এলাকা থেকে রায়হানকে আটক করা হয় বলে জানান উপকমিশনার আজবাহার আলী শেখ। তিনি জানান, ওই এলাকারও সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ মিলেছে। সেখানে রায়হানকে গণপিটুনি দেয়ার কোনো আলামত পাওয়া যায়নি। সিসিটিভির ফুটেজ, পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষী এবং পারিপার্শ্বিক অবস্থা পর্যবেক্ষণে এটা প্রাথমিকভাবে প্রমাণ হয়েছে যে, বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়িতে জখম হয়েছেন রায়হান। পরে তাকে সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

স্বজনদের অভিযোগ, ১০ হাজার টাকা না পেয়ে রায়হানকে পুলিশি হেফাজতে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। আর পুলিশ দাবি করেছে, নগরীর ১৪ নম্বর ওয়ার্ডের কাষ্টঘর এলাকায় ছিনতাইয়ের সময় গণপিটুনিতে নিহত হয়েছেন রায়হান। তবে স্থানীয় কাউন্সিলর বলছেন, যে এলাকায় গণপিটুনির কথা বলা হচ্ছে সেখানকার সিসিটিভি ক্যামেরা ফুটেজে এ ধরনের কোনোকিছু দেখা যায়নি।

এ ঘটনায় রোববার (১১ অক্টোবর) দিবাগত রাত আড়াইটার দিকে রায়হানের স্ত্রী তাহমিনা আক্তার তান্নী বাদী হয়ে একটি হত্যা মামলা করেন। মামলায় কোনো আসামির নাম উল্লেখ না করে অজ্ঞাত রাখা হয়েছে।

মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়, প্রতিদিনের মতো শনিবার (১০ অক্টোবর) বিকেল ৩টায় রায়হান আহমদ কর্মস্থল নগরীর স্টেডিয়াম মার্কেটস্থ ডা. গোলাম কিবরিয়া ও ডা. শান্তা রাণীর চেম্বারে যান। রাত ১০টার পর রায়হান বাসায় না ফেরায় তাঁর মোবাইলে ফোন দেওয়া হয়। তখন তার ফোন বন্ধ পায় পরিবার। ভোর সোয়া ৪টার দিকে অন্য একটি নম্বর থেকে রায়হান তাঁর মায়ের কাছে ফোন দেন। তখন রায়হান জানান, তিনি বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়িতে আছেন। তাকে বাঁচাতে দ্রুত টাকা নিয়ে ফাঁড়িতে যেতে বলেন।

রায়হানের চাচা হাবিবুল্লাহ ভোর সাড়ে ৫টার দিকে বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়িতে যান। তখন একজন পুলিশ সদস্য বলেন, রায়হান ঘুমিয়ে গেছে। আর যে পুলিশ সদস্য রায়হানকে ধরে নিয়ে এসেছেন তিনিও বাসায় চলে গেছেন। ওই পুলিশ সদস্য রায়হানের চাচাকে ১০ হাজার টাকা নিয়ে সকাল সাড়ে ৯টার দিকে ফাঁড়িতে আসার কথা বলেন বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।

এতে আরো বলা হয়, ‘পুলিশের কথামতো হাবিবুল্লাহ আবার সকাল পৌনে ১০টার দিকে ফাঁড়িতে যান। তখন দায়িত্বরত পুলিশ তাকে জানান, অসুস্থ হয়ে পড়ায় রায়হানকে ওসমানী মেডিকেলে ভর্তি করা হয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে রায়হানের চাচা ওসমানী হাসপাতালে গিয়ে জরুরি বিভাগে খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন, রায়হানকে সকাল ৬টা ৪০ মিনিটে হাসপাতালে ভর্তি করা হয় এবং সকাল ৭টা ৫০ মিনিটে তিনি মারা গেছেন। এ সময় হাবিবুল্লাহ পরিবারের অন্য সদস্য ও আত্মীয়স্বজনকে খবর দিলে তারা গিয়ে ওসমানী মেডিকেলের মর্গে রায়হানের ক্ষত-বিক্ষত লাশ দেখতে পায়।

এজাহারে বাদী উল্লেখ করেন, ‘আমার স্বামীকে কে বা কারা বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়িতে নিয়ে গিয়ে পুলিশি হেফাজতে রেখে হাত-পায়ে আঘাত করে এবং হাতের নখ উপড়ে ফেলে। পুলিশ ফাঁড়িতে রাতভর নির্যাতনের ফলে আমার স্বামী মারা গেছেন।’

এ ঘটনার প্রধান অভিযুক্ত বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়ির দায়িত্বরত কর্মকর্তা এসআই আকবর হোসেন ভূঁইয়া বা অন্য কোনো পুলিশ সদস্যকে গ্রেফতার করা হবে কিনা জানতে চাইলে তদন্ত কমিটির প্রধান আজবাহার জানান, এই মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই বাতেন হাসান তদন্তের স্বার্থে যা উপযোগী মনে করবেন, তা করবেন।

জকিগঞ্জ টাইমস/আর এম/০৯

আপনার মতামত প্রদান করুন
  • 3
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
এ বিভাগের অন্যান্য