চা বাগানে বেড়ে ওঠা মেয়েটি এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী

জাকগঞ্জ টাইমস : মা একজন চা শ্রমিক, দাদিও চা শ্রমিক ছিলেন, বাবা কোম্পানিতে চাকরি করেন খুব অল্প বেতন পান তা দিয়ে সংসার চালানো কঠিন।

তাই প্রাথমিকে পড়ার সময় অন্যের বাড়িতে কাজের জন্য স্কুল ছাড়তে হয় তাকে। তবে শিক্ষকদের অনুরোধে আবারো স্কুলে যেতে শুরু করে সে। এরপরের গল্পটি বেশ চমকানো। অন্যের বাড়িতে কাজের জন্য স্কুল ছাড়া সেই মেয়েটিই হয়ে উঠেন অনন্য। এই মেয়েটি তার সম্প্রদায়ের প্রথম কেউ, যে মাধ্যমিক পেরিয়ে এখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছেন।

গল্পটি থেরেসা নামে এক তরুণীর শ্রীলঙ্কার কান্ডালয়া অঞ্চলের চা শ্রমিক সম্পদায়ে তার বেড়ে ওঠা। প্রায় দুইশ’ বছর আগে দক্ষিণ ভারত থেকে শ্রীলঙ্কায় আসেন এই চা শ্রমিকরা। দরিদ্র এই চা শ্রমিকরা কোনোরকম খেয়ে-পরে দিনাতিপাত করতো। আর্থিক দীনতা আর সামাজিক অবস্থানের কারণে তারা ধরে নিয়েছিল, লেখাপড়া তাদের জন্য না। তবে থেরেসার এই সাফল্য পুরো চিত্রটিই হয়ত পাল্টে দিতে চলেছে।

শিক্ষার মাধ্যমেই নিজের সম্প্রদায়ের মানুষের দুঃখ ঘোচাতে চান থেরেসা। পড়াশোনা শেষে হতে চান শিক্ষক। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছুটিতে ফিরে যান তার পুরনো স্কুলে সেখানে ছাত্র-ছাত্রীদের পড়ান। সম্প্রতি সেখানকার ছাত্র-ছাত্রীদের নিয়ে একটি নাটকও করেছেন তারা। সেই নাটকে উঠে এসেছে চা শ্রমিক সম্প্রদায়ের জীবনযাত্রা ও শিশু-কিশোরদের বাস্তবতা। এসবের মাধ্যমে ছেলেমেয়েদের স্কুলে পাঠাতে অভিভাবকদের উদ্বুদ্ধ করছেন তারা।

নিজের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে থেরেসা বলেন, চা শ্রমিকদের জীবন খুব কঠিন। এখানে সবাইকে সংগ্রাম করতে হয়। তবে এখানে সবাই কাজ করে। কোনো কাজই অসম্মানের নয়। আর শিক্ষাই একমাত্র সুযোগ যার মাধ্যমে নিজেদের অবস্থার পরিবর্তন করতে পারি। শিক্ষার মাধ্যমেই আমরা একটি নতুন ভোর নিয়ে আসব।

আগে থেরেসাদের এলাকায় একটিমাত্র প্রাথমিক বিদ্যালয় ছিল। পরে ২০১৬ সালে একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। এর মধ্যদিয়েই সেখানকার ছেলেমেয়েদের উচ্চশিক্ষার পথ তৈরি হয়।

থেরেসা বলেন, ‘প্রাথমিকে পড়ার সময় একটি পুরনো ফ্যাক্টরির মধ্যে তাদের ক্লাস নেয়া হতো। মানুষ ভাবে, মেয়েদের লেখাপড়ার দরকার নেই। তবু কয়েকজন স্কুলে গেলেও কয়েক বছরের মধ্যে ঝরে পড়ে। অন্যেরা একেবারেই স্কুলে যায় না।’

তিনি আরো বলেন, ‘আমাদের স্কুল সবকিছু পাল্টে দিয়েছে। কারণ সবকিছুর পরিবর্তন সম্ভব। আমাদের গ্রামের একটা পরিচয় তৈরি করে দিয়েছে এই স্কুল। সেই সঙ্গে আমাদের সামনে একটা নতুন পৃথিবীর দরজা খুলে দিয়েছে।’

থেরেসা বলেন, ‘আমাকে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ দেয়া হয়েছে। আমাদের শুধু নিজেদের পড়াশোনা চালিয়ে গেলে হবে না, অন্যকেও শেখাতে হবে।’

থেরেসার মা পুশপামারি সাথিয়ামুথু বলেন, ‘থেরেসা যখন কিশোরী ছিল তখন সে স্কুল ছেড়ে গৃহপরিচারিকার কাজ শুরু করে। কিন্তু স্কুলের শিক্ষকরা চাইলেন, সে পড়াশোনা করুক। পরে তারা তাকে অনেকটা জোর করে স্কুলে ফিরিয়ে নিয়ে গেলেন। আমরা রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে বাগান থেকে চায়ের পাতা তুলি। জোঁকের কামড় খেতে হয়। আমার মেয়ে যখন শিক্ষক হবে তখন সে আমাদের সম্প্রদায়কে পুনর্নির্মাণ করবে।’

জকিগঞ্জ টাইমস/আর এম/০৮

আপনার মতামত প্রদান করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
এ বিভাগের অন্যান্য