এক নজরে সুফি সাধক শিতালং শাহ

 

 

বরাক-সুরমার উৎপত্তিস্থল জকিগঞ্জের বারঠাকুরীতে শুয়ে আছেন অসংখ্য আধ্যাত্বিক গানের অমর স্রষ্টা সুফি সাধক শাহ শিতালং রা.।
আঁচলের আড়ালে এক মূল্যবান মুক্তার নাম শিতালং শাহ রহ.। হযরত শাহজালাল শাহপরাণ রহ.সহ ৩৬০ আউলিয়ার পদধ্বনিতে সিলেট হয়ে উঠে যেমন বাংলার আধ্যাত্মিক রাজধানী। তেমনই এপুণ্যভূমির আধ্যাত্মিকতা ও স্বকীয়তা রক্ষায় যুগে যুগে এখানে জন্ম নিয়েছেন অনেক ওলী-আউলিয়া।
শিতালং শাহ (১৮০৬-১৮৯৯)জন্ম আনুমানিক ১৮০৬ সালে তৎকালীন করিমগঞ্জ মহকুমায়। তাঁর নাম মোহাম্মদ সলিম। সাধক কবি। মরমি গানের রচয়িতা।তাঁর রচিত গ্রন্থ : ‘রাগ বাউল’, ‘কিয়ামতনামা’, ‘মুসকিল তরান’ ও ‘হাসরতরান’। শীতালং শাহ ১২৯৬ বঙ্গাব্দের ১৭ অগ্রহায়ণ মৃত্যুবরণ করেন।
তাঁর প্রকৃত নাম মোহাম্মদ সলিম উল্লাহ, ফকিরি নাম শিতালং শাহ। ১২০৭ বঙ্গাব্দে সিলেট (পূর্বতন) জেলার করিমগঞ্জ মহকুমার শ্রীগৌরি গ্রামে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। পিতার নাম জাহা বখ্শ মুনশী ওরফে কামাল শাহ এবং মাতা সুরুত বিবি। জিতু মিয়া/হাজী সাব নামক এক মৌলভীর কাছে বালক সলিম মক্তবের পাঠ সমাপ্ত করেন। আনুমানিক ১০/১২ বৎসর বয়সে সলিমকে তৎকালীন সিলেট জেলার ইসলামি শিক্ষার প্রাণকেন্দ্র বর্তমানে গোলাপগঞ্জ উপজেলার ফুলবাড়ি মাদরাসায় ভর্তি করে দেয়া হয়। মাদরাসা শিক্ষা সমাপ্ত হলে শিতালং শাহ তাঁর মুর্শিদ যুগশ্রেষ্ঠ ওলী শাহ আবদুল ওহাব (রহ.) এর খেদমতে অবস্থান করেন।
এ সময় তাঁর মুর্শিদ তাঁকে নির্জন সাধনার পরামর্শ দেন। পীরের নির্দেশে তিনি ভুবনের পাহাড়ে আত্মগোপন করেন এবং সাধনায় মগ্ন হন। শিতালং শাহের কেরামতি আজো করিমগঞ্জ, চাপঘাট পরগনার লোকদের মুখে মুখে ফিরে। ভুবনের পাহাড়ে আত্মগোপনকালে শিতালং শাহের মাতা জীবিত ছিলেন। পুত্রের বিরহে আকুল হয়ে তিনি চারজন লোক পাঠালেন শাহ আবদুল ওহাব (রহ.) এর কাছে। জানতে চাইলেন- মায়ের অনুমতি ব্যতিত কেন তাঁর পুত্রকে জঙ্গলবাসী করা হল। মুর্শিদ লোকদের বলে দিলেন- শিতালং’র আম্মাকে বলবেন, তাঁর পুত্র আগামী এক সাপ্তাহের মধ্যে মায়ের খেদমতে হাজির হবে। ছেলে আসার খবর শুনে মা আনন্দে আত্মহারা হয়ে নানা ধরনের পিঠাপুলি, দুধের সর জমা করে শিকায় তুলে রাখতে লাগলেন। কোন এক গভীর রাতে শিতালং শাহ বাড়ির আঙিনায় এসে, ‘মাই গো তুমি কই’ বলে ডাক দেন। মা ঘর থেকে বের হয়েই ভয় পেয়ে যান। একি শিতালং শাহ বাঘের উপর সওয়ার। শিতালং বললেন, ‘ভয় কর না মা, এরা আমার পোষা কুকুর। শিকায় রাখা পিঠাগুলি নিয়ে আস, আর আমাকে আল্লাহর রাস্তায় বিদায় দাও।’ মা উৎফুল্ল চিত্তে পিঠা নিয়ে এসে একটু খাইয়ে ‘আল্লাহর হাওলা’ বলে বিদায় দিলে বাঘ তাঁকে নিয়ে জঙ্গলে চলে যায়। এরপর দীর্ঘদিন তিনি অজ্ঞাত ছিলেন।
তারপর দীর্ঘ এগারো বছর পর সুনামগঞ্জের লাউড়ের পাহাড়ের পাদদেশে ৩৬০ আউলিয়ার অন্যতম হযরত শাহ আরেফিন (রহ.) (লোকমুখে শারফিন নামে পরিচিত) এর মাজারের পার্শ্বে ধ্যান মগ্ন অবস্থায় এক পোনা মাছ শিকারী তাঁকে দেখতে পায়। কাছে গিয়ে অনেকক্ষণ দাড়িয়ে থাকে লোকটি। ধ্যানমগ্ন থাকায় লোকটি বাড়ি চলে যায়। পরদিন এক ঘটি গরম দুধ নিয়ে সে জঙ্গলবাসী দরবেশের কাছে আসে। লোকটি বিনয়ের সহিত তাঁকে দুধ পান করতে অনুরোধ জানালে তিনি তাকে সন্তুষ্ট করার জন্য দুধটুকু পান করেন। এক পর্যায়ে লোকটি নাম জানতে চাইলে জবাব দিলেন, ‘শিতালং’, বাড়ি? কাছাড়।
লোকমুখে এই সংবাদ প্রচার হলে দলে দলে মানুষ আসতে লাগল দরবেশের সাথে দেখা করতে। এদিকে তাঁর মুর্শিদের হুকুম হয় বনবাস সমাপ্তি করে সংসার ও ধর্ম প্রচারের। বিয়ে করেন বদরপুরের গড়কাপন মৌজার মাজু মিয়ার বোনকে। তাঁর অনুপম চরিত্র, কারামতি দেখে দলে দলে লোকজন তাঁর কাছে মুরিদ হতে থাকে। মুরিদগণ জমি দান করত তাঁকে একটি বাড়ি বানাতে অনুরোধ জানালে তিনি অসম্মতি প্রকাশ করেন। এক রাতে শাহ সাহেব তাঁর হুজরার বাইরে বসে হুক্কা টানছেন। এমন সময় হুক্কার নইচা ঘুরিয়ে ‘দূর দূর’ করে কি যেন তাড়াতে লাগলেন। তাঁকে ঘিরে রাখা মুরিদগণ জানতে চাইলেন এখানে তো কিছু দেখা যায় না, তবে তিনি কি তাড়ালেন। শাহ সাহেব বললেন- জাব্দার হাওরে (যা শিতালং শাহের হুজরা থেকে প্রায় তিন মাইল দূরে) মহিষের দলের উপর বাঘ আক্রমণ করেছে। মহিষগুলো ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে পড়েছে দেখে তিনি বাঘগুলোকে তাড়িয়ে দিলেন। পরদিন জনশ্রুতি উঠে, বাঘ মহিষের দলে আক্রমণ করেছিল। কিন্তু মহিষের কোনো ক্ষতি হয়নি। বাঘগুলো দৌড়ে পালিয়ে যায়। সুফি শিতালং শাহ ছিলেন মহান প্রভুর প্রেমে দগ্ধ একজন বিশিষ্ট আবদাল।
আবদালগণ ওলীদের বিশেষ শ্রেণী। তাদের শান-শওকত ওলীদের উপরে। তাঁরা লোক চক্ষুর অন্তরালে থাকেন। অর্থাৎ তাদের কর্মকান্ড সাধারণ লোকদের চিন্তার বাহিরে। মোহররমের চান্দের এক বিকালে হঠাৎ করে সুফি শিতালং শাহ তাঁর হাতের লাঠি ঘুরাতে লাগলেন। কিছুক্ষণ পর, ‘সাবাশ! সাবাশ! কি সুন্দর মেডেল বলে আনন্দ উল্লাস করতে থাকেন। শিষ্যগণ কারণ জানতে চাইলে বলেন- তাঁর এক বন্ধুকে লাঠি খেলায় সাহায্য করলেন। ফলে সে খুব সুন্দর একটা মেডেল পেয়েছে। পরে মুরিদগণ খবর নিয়ে জানতে পারেন- সেদিন ভারতের কলকাতায় লাঠি খেলা উৎসব হয় এবং শাহ সাহেবের বন্ধু খেলায় জয়ী হয়ে একটি সুন্দর মেডেল লাভ করেন। শাহ সাহেব তাঁর এক বন্ধুর সঙ্গে ওয়াদা করেছিলেন এক সাথে হজ্জ পালন করবেন। তাঁর ঐ বন্ধু পায়ে হেঁটে মদীনায় পথে রওয়ানা হয়ে যান। আরাফাতের ময়দানে গিয়ে তিনি শিতালং শাহের সাক্ষাৎ লাভ করেন। তখন শিতালং শাহের নাতি মাওলানা তৈয়বুর রহমান জীবিত ছিলেন। শিতালং শাহ মক্কা-মদিনায় তাওয়াফ ও জিয়ারতের পর তাঁর ঐ বন্ধুর হাতে একটি লাঠি দিয়ে বলেন, লাঠিটি তাঁর নাতি মাওলানা তৈয়বুর রহমানের হাতে পৌঁছে দেওয়ার জন্য। বন্ধু বাড়িতে এসে শুনতে পান ইনসানে কামিল সুফি শিতালং শাহ বছর খানেক পূর্বে জান্নাতবাসী হয়ে মহান আল্লাহর কাছে চলে গেছেন। ঐ লাঠিটি দীর্ঘদিন যাবৎ মাওলানা তৈয়বুর রহমানের হেফাজতে ছিল।
কুতবুল ইর্শাদ সুফি শিতালং শাহ ছিলেন স্বভাব কবি। সিলেটী নাগরীতে তাঁর লেখা ১২০০ পৃষ্ঠাব্যাপী একটি কবিতা ও গানের বই পাওয়া যায়। তাঁর জীবদ্দশায় তাঁর অসম্মতির কারণে এসব গান ও কবিতা ছাপা হয়নি। ওফাতের পর মুরিদগণ তাবিজ হিসাবে ব্যবহারের জন্য অনেক গান ও কবিতার খাতা নিয়ে যান।

 

আপনার মতামত প্রদান করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
এ বিভাগের অন্যান্য