করোনাভাইরাস কেন ভণ্ডামিরও মহামারী লুক জাফির

কাজের পর আপনি রাতের খাবারের জন্য কিছু কিনতে সুপারমার্কেটে গেলেন। আপনি ক্লান্ত, উদ্বিগ্ন ও বেশ ক্ষুধার্ত। পাশাপাশি আপনি মাস্কও পরেছেন, কারণ সেখানে অনেক মানুষের উপস্থিতি রয়েছে এবং সে অবস্থায় সামাজিক দূরত্বের নিয়ম মেনে চলাও বেশ কঠিন। সবকিছুর পর এখন আপনি অস্বস্তি বোধ করছেন।

মাঝে মাঝে আমাদের সবাইকে এ ধরনের অনুভূতির মধ্য দিয়ে যেতে হয়। কিন্তু আমরা সেটা সহ্য করি কারণ এখন একটা মহামারী চলছে এবং আমাদের সবাইকে নিজেদের নিরাপদে রাখার কাজটা করে যেতে হবে। কেবল একজন ব্যক্তি ছাড়া। যে কিনা দোকানে ঢোকার আগে মাস্ক লাগিয়ে নিয়েছিল। সামনে গিয়ে সে ব্যক্তি চিত্কার করে মাস্ক না পরার, শ্বাস নেয়ার ও নিপীড়নমুক্ত হওয়ার দাবিতে চিত্কার করতে লাগল।

সে বলতে থাকল, যে কেউ মাস্ক পরতে পারে যদি সে তা বেছে নেয়, কিন্তু আমি না। আমার না পরার অধিকার আছে এবং আমি মুক্ত।

এটা ভণ্ডামি। ভণ্ডামি হচ্ছে যখন আমরা নিজেদের নৈতিকতায় স্থির থাকতে পারি না। আমরা প্রায়ই বলি একটা এবং করি আরেকটা।

মাস্কবিরোধীরা বিশ্বাস করে তাদের অধিকার রয়েছে। কিন্তু মাস্ক পরা প্রত্যাখ্যানের ভেতর দিয়ে তারা অন্য মানুষের নিরাপদে বাঁচার অধিকারকে খারিজ করছে। জাতিসংঘের মানবাধিকারের সার্বজনীন ঘোষণাপত্র জানায়, প্রত্যেকের জীবনের, স্বাধীনতার ও ব্যক্তির সুরক্ষার অধিকার রয়েছে। এই অধিকারগুলো অবিচ্ছিন্নভাবে অন্তর্নির্মিত। নিরাপত্তাবিহীন যে স্বাধীনতা তা প্রকৃতই স্বাধীনতায় কিনা তা নিয়ে বিতর্ক আছে।

আশ্চর্যজনকভাবে আমাদের ভণ্ড হওয়ার প্রাথমিক উপায়টি হচ্ছে চিন্তার ক্ষেত্রে নমনীয় হওয়া—জ্ঞানীয় নমনীয়তা, যাকে বলা হয় বিমূর্ততা। নিয়মের প্রয়োগ ক্ষেত্রে আমরা ফাঁকফোকরগুলো তৈরি করি, কারণ আমরা নিয়মগুলো তৈরি করি অনেক বেশি তাত্ত্বিকভাবে। যা বাস্তব পৃথিবীর অবস্থার সঙ্গে খাপ খায় না।

ভণ্ডামি কেন এত খারাপ?

যখন আমরা ভণ্ডামি করি, তখন আমরা অন্যায়ের জন্ম দিই। এর মাধ্যমে আমরা হয়তো সঠিক কাজ করতে ব্যর্থ হই, যা কিনা মানুষকে আহত করে কিংবা আরো বেশি অসুস্থ করে দিতে পারে। তবে ভণ্ডামির সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে এটি আমাদের ব্যক্তিগত সত্যের বিপর্যয়ের কারণ। যদি আমরা কোনো নীতিতে বিশ্বাস করি, কিন্তু সেটা যদি আমরা নিজেদের ওপর প্রয়োগ না করি তবে সেই নীতি অর্থহীন।

অনেক স্বৈরাচারী ও ফ্যাসিস্ট ভণ্ড হয়ে থাকে। তারা প্রায়ই কিছু তাত্ত্বিক মূল্যবোধ রক্ষার কথা বলে, যেমন জাতীয় নিরাপত্তা, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য কিংবা এমনকি স্বাধীনতার কথাও। যদিও নিরাপত্তা কিংবা স্বাধীনতার বিমূর্ত ধারণার কোনো মূল্য বা অর্থ নেই যদি আপনি নিজের মানুষদের ওপর হত্যা ও নিপীড়ন চালান। সব ভণ্ডামি রক্ত ঝরায় না। কিন্তু আমরা এর কিছু বাজে ফলাফল দেখতে পাই। মৌলিক ভণ্ডামিগুলোর একটি হচ্ছে অধিকার ভোগের সঙ্গে যে দায়িত্ব হাজির হয় তাকে উপেক্ষা করা।

আপনি কি বাঁচার স্বাধীনতা চান? তাহলে আপনি বেঁচে থাকার অধিকারের জন্য দায়বদ্ধ। আপনি নিজের জিনিসের মালিক হতে চান? তাহলে আপনার অন্যের মালিকানার ব্যাপারে শ্রদ্ধাশীল থাকতে হবে। আপনি যদি জনপরিসর ব্যবহার করতে চান তাহলে আপনার দায়িত্ব হচ্ছে তা অন্যদের সঙ্গে ভাগাভাগি করা।

দায়িত্ব না নিয়ে নিজের অধিকারের ওপর বিশ্বাস করা হচ্ছে ভণ্ডামি। এই দ্বিচারিতা যেখানে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিকে এড়িয়ে গিয়ে বিমূর্ত কিছু নীতিকে বিবেচনা করছেন।

দ্বিচারিতা বিশেষভাবে এখন কেন ভয়ানক?

আমাদের কি প্রয়োজন তা নিয়ে একমত না হতে পারি কিন্তু এই মুহূর্তে আমরা প্রমাণ ও সত্যকে এড়িয়ে যেতে পারি না। শিক্ষা, পরিচ্ছন্ন বাতাস, পানি, স্বাস্থ্য ও পরিবেশ এগুলো আমরা সবাই ভাগাভাগি করি এবং এগুলো থেকে আমরা সবাই সুবিধা লাভ করি। আমরা অসুস্থ হয়ে পড়ছি, আমাদের অর্থনীতি বন্ধ হয়ে গেছে, রোগের কারণে আমরা প্রিয়জনকে হারাচ্ছি। জনস্বাস্থ্যের সার্বিক উন্নতি ছাড়া আমাদের জীবনমান ভয়ানকভাবে নিচে নেমে গেছে। ভণ্ডামির একটি দৃষ্টিভঙ্গি বলছে, আমি জনস্বাস্থ্যের ভালো অবস্থা থেকে সুবিধা নিতে রাজি আছি কিন্তু আমি তার জন্য বিধিনিষেধ মানতে রাজি না।

ভণ্ডরা সরাসরি এটা বলে না বা চিন্তা করে না। তারা এই ইস্যুকে দেখে বিভিন্ন বিমূর্ত অধিকারের পূর্ণতা হিসেবে। এটা অনেকটা এ রকম যে আমার জনসম্মুখে মুখোশ না পরার অধিকার আছে।

দ্য কনভারসেশন থেকে সংক্ষেপে অনূদিত

জকিগঞ্জ টাইমস / টমস 

আপনার মতামত প্রদান করুন
  • 1
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
এ বিভাগের অন্যান্য