আকুল প্রার্থনার বিনিময়ে ইসলাম পেয়েছি

মধ্যবিত্ত একটি পরিবারে আমার জন্ম। মা-বাবা ধার্মিক না হলেও আমাদের আচার-আচরণ ও শিষ্টাচার শেখানোর ক্ষেত্রে তাঁদের কোনো কমতি ছিল না। শৈশবের কোনো কোনো সময় আমি স্রষ্টার কাছে পথের দিশা চাইতাম এবং তাঁর অস্তিত্ব স্বীকার করে নিতাম। ছয় বছর বয়সে মা-বাবার কাছে আমি স্থানীয় চার্চের রবিবারের প্রার্থনায় যোগ দেওয়ার অনুমতি চাই এবং ১০ বছর বয়সে বাইবেল শিক্ষা কোর্সে নিবন্ধন করি। তবে ব্যক্তিগত জীবনে ধর্মানুরাগ ছিল খুব সামান্য সময়ের জন্য। আমি অন্য ১০টি ইংলিশ মেয়ের মতোই চলাফেরা করতাম। ব্যক্তিগত জীবনে আমি ছিলাম অসুখী। রাতের বেলা কখনো কখনো আমি বিছানায় শুয়ে নিজের জীবন নিয়ে ভেবে লজ্জিত হতাম। এমনকি কাঁদতামও। স্রষ্টার কাছে প্রার্থনা করতাম এবং তাঁর কাছে ক্ষমা ও সাহায্য চাইতাম। আবার ভেবে অবাক হতাম, একটি যুবতী মেয়ে হয়ে আমি স্রষ্টার কাছে সাহায্য চাইছি কেন? আমার পরিবার, আমার বন্ধু বা সমাজ কেউ তো আমাকে তাঁর সম্পর্কে কিছু শেখায়নি? বিপদে পড়লে আমি কেনই বা তাঁর কাছে ফিরে যাই?

১৫ বছর বয়সে বেশ কিছু ঘটনা জীবন সম্পর্কে আমার দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দেয়। স্কুলজীবনের শেষ বছর আমার তিন বন্ধু মারা যায়। প্রথমে ১৭ বছর বয়সী একটি ছেলে মোটর বাইক দুর্ঘটনায় মারা যায়। কয়েক মাস পর এক বন্ধু অ্যাজমায় আক্রান্ত হয় এবং অস্ত্রোপচারের সময় সে মারা যায়। দুজন তরুণ বন্ধুর মৃত্যু আমাকে মানবিকভাবে ভেঙে দেয়। কিন্তু আমি কি জানতাম আমার জন্য আরো কষ্টদায়ক কিছু অপেক্ষা করছে? স্কুলের শেষ দিন এক বন্ধু গাড়ির ধাক্কায় স্কুলের সামনে আহত হয়ে পড়ে থাকে। কয়েক দিন পর সে মারা যায়। এরপর কয়েক রাত আমি চোখ বুঝলে তার মুখ দেখতে পেতাম। তখন মনের অজান্তে আমি আবার স্রষ্টার প্রতি ঝুঁকে যাই। আমার মনে হলো, জীবন, মৃত্যু ও মৃত্যু-পরবর্তী জীবন সম্পর্কে জানতে পাঠাগারে যেতে পারি আমি। কেননা গত এক বছরে আমি শিখেছিলাম জীবন যেকোনো মুহূর্তে শেষ হতে পারে।
১৯৯১ সালে আমি লন্ডনের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন পড়তে যাই। সেখানে আমার এক যুবকের সঙ্গে দেখা হয়, যিনি একজন মুসলিম ছিলেন এবং আমি তাঁকে বিয়ে করি। তাঁর মুসলিম বন্ধুদের সঙ্গেও মেশার সুযোগ হয়। তবে তারা ধার্মিক মুসলিম ছিল না। সে সময় আমরা বহু রাত ঘরের বাইরে কাটিয়েছি। একদিন দলের একটি ছেলে আমার ছাত্রাবাসে এলো এবং সে ছিল পাঞ্জাবি-পায়জামা পরা, তার মুখে দাড়ি। আমি অবাক হয়ে গেলাম সে ধর্মচর্চা শুরু করেছে। দেখা হলে সে আমাকে জড়িয়ে ধরত, সেখানে সে মুচকি হেসে বলল, আমি তোমাকে আর জড়িয়ে ধরতে পারব না। আমার ধারণা ছিল, ধর্মচর্চা খুবই বিরক্তিকর। কিন্তু সেই ছেলেটির চেহারায় আমি সব সময় প্রশান্তি দেখতে পেতাম।

এরপর একদিন ছেলেটি আমার ছাত্রাবাসে এলো এবং ইসলাম সম্পর্কে আলোচনা করল। আমি মুগ্ধ হয়ে তার আলোচনা শুনলাম। অবাক হলাম তার ভঙ্গি ও ধর্মের প্রতি তার শ্রদ্ধাবোধ দেখে। ধীরে ধীরে আমার ইসলামের কথাগুলো যৌক্তিক মনে হতে থাকে। যেমন—ইসলাম মদ ও অবৈধ যৌনতা নিষিদ্ধ করেছে, কিশোর বয়স থেকে এসব বিষয় মানতে পারলে আমার জীবন হয়তো অন্য রকম হতো। পশ্চিমা বিশ্বের নারীরা জানে পোশাক তাদের জীবনে কতটা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু আমি প্রথম অনুভব করলাম কেউ পোশাকের ঊর্ধ্বে আমার ব্যক্তিত্ব মূল্যায়ন করছে। ১৯৯২ সালে আমি ইসলাম সম্পর্কে পড়তে শুরু করি। কোরআনের ইংরেজি অনুবাদ পড়ি। নামাজসহ অন্য ইবাদতগুলো সম্পর্কে জানতে থাকি। একদিন আমার বন্ধু, পরবর্তী সময়ে স্বামী আমাকে ফোন দিয়ে বলল, তারা পরদিন রিজেন্ট পার্ক মসজিদে যাবে। আমি চাইলে সেখানে ইসলাম গ্রহণ করতে পারি। কিন্তু আমি তখনো ইসলামের জন্য প্রস্তুত ছিলাম না। ইসলাম গ্রহণের পর জীবন কেমন হবে, তা ভেবে চিন্তিত ছিলাম। আমি সময় নিলাম এবং ইসলাম সম্পর্কে আরো জানলাম। অবশেষে ৫ জুলাই ১৯৯৩ ইসলাম গ্রহণ করলাম।

ইয়াসমিন উম্মে আমানি
আকুল প্রার্থনার বিনিময়ে ইসলাম পেয়েছি
নওমুসলিমের কথা

কালেরকন্ঠ / জকিগঞ্জ টাইমস / টমস

আপনার মতামত প্রদান করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
এ বিভাগের অন্যান্য