নবী (সা.) এর সহধর্মিণীদের নাম এবং সংক্ষিপ্ত পরিচিতি (পর্ব-২)

জকিগঞ্জ টাইমস : আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কোরআনুল কারিমে বলেন,
لَقَدْ كَانَ لَكُمْ فِي رَسُولِ اللَّهِ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ لِّمَن كَانَ يَرْجُو اللَّهَ وَالْيَوْمَ الْآخِرَ وَذَكَرَ اللَّهَ كَثِيرًا
‘যারা আল্লাহ ও শেষ দিবসের আশা রাখে এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে, তাদের জন্যে রাসূলুল্লাহর মধ্যে উত্তম নমুনা রয়েছে।’ (সূরা: আহযাব, আয়াত: ২১)।

আল্লাহ তায়ালা আরো বলেন,
وَإِنَّكَ لَعَلى خُلُقٍ عَظِيمٍ

‘আপনি অবশ্যই মহান চরিত্রের অধিকারী।’ (সূরা: আল কলম, আয়াত: ৪)।

বিশ্বনবী রাসূলুল্লাহ (সা.) এর প্রতিটি কথা, প্রতিটি কাজ, মৌন সমর্থন, হাসি, কান্না, আনন্দ, দুঃখ, কথাবার্তা, আলাপ-আলোচনা, উপদেশাবলী, পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র অর্থাৎ পায়ের নখ কাটা থেকে আরম্ভ করে রাষ্ট্র পরিচালনা পর্যন্ত সর্বক্ষেত্রে মানুষের জন্যে রয়েছে অনুসরণের বাস্তব নমুনা। রাসূলুল্লাহর (সা.) জীবনের প্রতিটি পর্যায় অনুসরণযোগ্য বিধায় আলোচনার দাবী রাখে। তবে আজ আমরা শুধুমাত্র রাসূলুল্লাহর (সা.) পরিবারের (স্ত্রীদের) সংক্ষিপ্ত পরিচিতি তুলে ধরবো। (১ম পর্বের অংশবিশেষ)।

১ম পর্বে প্রিয়নবী রাসূলুল্লাহ (সা.) এর ১১ স্ত্রীর সংক্ষিপ্ত পরিচিতি তুলে ধরা হয়েছে। ২য় পর্বে থাকছে রাসূল (সা.) এর ১১ বিয়ের কারণসহ আরো অন্যান্য বিষয়ের সংক্ষিপ্ত আলোচনা।

লেখাটি- আল্লামা ছফিউর রহমান মোবারকপুরী’র ‘আর রাহীকুল মাখতুম’ (রাসূলুল্লাহ (সা.) এর সর্বশ্রেষ্ঠ জীবনী গ্রন্থ) থেকে নবী পরিবারের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি অধ্যায়টি হুবুহু তুলে ধরা হলো।

গ্রন্থটি বাংলা ভাষায় অনুবাদ করেছেন- খাদিজা আখতার রেজায়ী।

২য় পর্ব >>>
রাসূল (সা.) উল্লিখিত ১১ জন নারীকে বিয়ে করেন। অন্য দু‘জন নারী, যাদের তাঁর কাছে পাঠানো হয়নি, তাদের একজন বনু কেলাব গোত্রের এবং অন্যজন কেন্দা গোত্রের ছিলেন। কেন্দা গোত্রের এ নারীর সঙ্গে রাসূল (সা.) এর বিয়ে হয়েছিলো কি না এবং তার প্রকৃত নাম ও বংশ পরিচয় কি, সে সম্পর্কে সীরাতকারদের মধ্যে অনেক মতভেদ রয়েছে। সেসব উল্লেখ করার কোনো প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না।

দাসীদের প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যায়, রাসূল (সা.) এর দু‘জন দাসী ছিলেন। তাদের একজন হচ্ছেন মারিয়া কিবতিয়া। মিসরের শাসনকর্তা মোকাওকিস তাকে উপঢৌকন হিসেবে প্রেরণ করেন। তার গর্ভ থেকে রাসূল (সা.) এর পুত্র হজরত ইব্রাহিম জন্ম নেন। তিনি দশম হিজরির ২৮ অথবা ২৯ শাওয়াল মোতাবেক ৬৩২ ঈসায়ী সালের ২৭ জানুয়ারি ইন্তেকাল করেন।

অন্য একজন দাসীর নাম ছিলো রায়হানা, তিনি বনু নযির বা বনু কোরায়যা গোত্রভুক্ত। যুদ্ধবন্দীদের সঙ্গে তিনি মদিনায় আসেন। রাসূল (সা.) রায়হানাকে পচ্ছন্দ করে নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখেন। তার সম্পর্কে গবেষকদের ধারণা হচ্ছে, নবী করিম (সা.) তাকে দাসী হিসেবে রাখেননি। বরং মুক্ত করে বিয়ে করেন। আল্লামা ইবনে কাইয়েম লিখেছেন, নবী করিম (সা.) রায়হানাকে দাসী হিসেবেই রেখেছিলেন। আবূ ওবায়দা এ দু‘জন দাসী ছাড়াও নবী করিম (সা.) এর আরো দু‘জন দাসীর উল্লেখ করেছেন। তাদের একজনের নাম ছিলো জামিলা। তিনি এক যুদ্ধে গ্রেফতার হন। অন্য একজন দাসীকে নবী সহধর্মিণী হজরত যয়নব বিনতে জাহশ (রা.) নবী করিম (সা.)-কে হেবা করে দেন। (দেখুন- জাদুল মায়াদ, প্রথম খণ্ড,পৃ.২৯)।

এখানে আমরা রাসূল (সা.) এর জীবনের একটি বিশেষ দিক সম্পর্কে আলোকপাত করা খুবই প্রয়োজন মনে করছি। যৌবনের এক বিরাট অংশ প্রায় ত্রিশ বছরকাল তিনি মাত্র একজন স্ত্রীর সঙ্গে অতিবাহিত করেন। তাও তিনি ছিলেন এমন এক স্ত্রী, যাকে বলা যায় প্রায় বৃদ্ধা। তার মৃত্যুর পর তিনি আরেকজন বৃদ্ধা নারীকে বিয়ে করেন। প্রথমে হজরত খাদিজা, এরপর হজরত সাওদা (রা.)। এভাবে জীবন কাটিয়ে বার্ধক্যে উপনিত হওয়ার পর হঠাৎ করে কি তাঁর যৌনশক্তি এতো বেড়ে গিয়েছিলো যে, তাঁকে এতোগুলো বিয়ে করতে হলো? নাউযু বিল্লাহ! তা নয়। নবী (সা.) জীবনের উল্লিখিত দু‘টি অধ্যায়ের প্রতি দৃষ্টিপাত করলে কাণ্ডজ্ঞানসম্পন্ন কোনো মানুষই এমন অপবাদ দিতে পারবে না। আসলে রাসূল (সা.) বিশেষ বিশেষ উদ্দেশ্যেই এতোগুলো বিয়ে করেছিলেন। নির্দিষ্ট সংখ্যার সাধারণ বিয়ের চাইতে নবী করিম (সা.) এর উদ্দেশ্য ছিলো অনেক মহৎ।

এর ব্যাখ্যা হচ্ছে, রাসূল (সা.) হজরত আয়েশা (রা.) এবং হজরত হাফসা (রা.)-কে বিয়ে করে হজরত আবূ বকর এবং হজরত ওমরের সঙ্গে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ করেছিলেন। এভাবেই হজরত ওসমান (রা.) এর হাতে পর পর দুই কন্যাকে তুলে দিয়ে এবং হজরত আলীর সঙ্গে প্রিয় কন্যা হজরত ফাতেমার বিয়ে দিয়ে নবী করিম (সা.) উল্লিখিত চার জন সাহাবির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ আত্নীয়তার বন্ধনে আবদ্ধ হন। কেননা, উক্ত চার জন সাহাবি ক্রান্তিকালে ইসলামের সৈনিক হিসেবে অতুলনীয় ত্যাগ-তিতিক্ষার পরিচয় দিয়েছিলেন। ইসলামের জন্য তাদের সেবা ও আত্নত্যাগের ঘটনা তো সবার জানা।

আরবে নিয়ম ছিলো, তারা শ্বশুর সম্পর্কিত আত্নীয়তার বিশেষ গুরুত্ব দিতো। আরবদের দৃষ্টিতে জামাতা সম্পর্ক বিভিন্ন গোত্রের মধ্যে সম্পর্ক সুদৃঢ়করণে বিশেষ ভুমিকা পালন করে। জামাতার সঙ্গে যুদ্ধ করা তারা লজ্জাজনক মনে করতো। এ নিয়মের কারণে রাসূল (সা.) ইসলামের প্রতি বিভিন্ন গোত্রের শক্রতা শক্তি খর্ব করতে তাদের নারীদের সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপন করেন। উদাহরণস্বরুপ বলা যায়, হজরত উম্মে সালামা (রা.) ছিলেন বনু মাখজুম গোত্রের মেয়ে। আবু জাহল এবং খালেদ ইবনে ওলীদ এ গোত্রেরই লোক ছিলো। এ গোত্রে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপনের পর খালেদ ইবনে ওলীদের মধ্যে ইসলামের প্রতি তেমন প্রবল শক্রতা লক্ষ্য করা যায়নি,বরং কিছুকাল পর তিনি স্বেচ্ছায় ইসলাম গ্রহণ করেন। এমনিভাবে রাসূল (সা.) আবু সুফিয়ানের কন্যা উম্মে হাবিবা (রা.)-কে বিয়ে করার পর আবু সুফিয়ান ইসলামের শক্রতা কররেও কখনো সামনে আসেননি। হজরত জুওয়াইরিয়া এবং হজরত সফিয়া নবী করিম (সা.) এর সঙ্গে বিয়ে হওয়ার পর বনু মোস্তালেক এবং বনু নজির গোত্র ইসলামের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা ছেড়ে দেয়। এ দু‘টি গোত্রে নবী করিম (সা.) এর বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপনের পর তারা ইসলামের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে এমন প্রমান পাওয়া যায় না। হজরত জুয়াইরিয়া তো তার গোত্রের জন্য সব নারীর চেয়ে অধিক বরকতসম্পন্ন প্রমাণিত হয়। রাসূল (সা.) তাকে বিয়ে করার পর সাহাবায়ে কেরাম উক্তেোগোত্রের একশ যুদ্ধবন্দী পরিবারকে বিনাশর্তে মুক্তি দেন। তারা বলেছিলেন, এরা এখন রাসূল (সা.) এর শ্বশুর পক্ষের লোক। বনী মোস্তালেক গোত্রের লোকদের মনে এ দয়ার অসামান্য প্রভাব পড়ে।

সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি উচ্ছৃঙ্খল জাতিকে প্রশিক্ষণ দিয়ে তাদের মানসিক পরিশুদ্ধির ব্যবস্থা করে সভ্যতা-সংস্কৃতির আলোয় আলোকিত করার দায়িত্বে নিযুক্ত ছিলেন। ওরা ছিলো সভ্যতা-সংস্কৃতির সব উপায় উপকরণ এবং সমাজ বিনির্মাণ ও রুপায়ণের যাবতীয় দায়-দায়িত্ব সম্পর্কে একেবারে অজ্ঞ। যেসব নীতির ভিক্তিতে ইসলামি সমাজ গড়ে তোলা দরকার ছিলো, সে ক্ষেত্রে নারী-পুরুষ ভেদাভেদ করার কোনো সুযোগ ছিলো না, কিন্তু ভেদাভেদ মুক্ত চিন্তাধারার আলোকে নারীদের সরাসরি শিক্ষা দেয়াও সম্ভব ছিলো না। অথচ তাদের শিক্ষা দেয়ার প্রয়োজনীয়তা কোনো অংশেই পুরুষদের চেয়ে কম ছিলো না, বরং বলা যায় বেশিই ছিলো।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সামনে একটি পথই খোলা ছিলো, তা হচ্ছে বিভিন্ন বয়স ও যোগ্যতর নারীদের মনোনীত করা, যারা বর্ণিত উদ্দেশ্য বাস্ত্যবায়নে তারা যথেষ্ট হবেন। অতঃপর মনোনীত নারীদের তিনি শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ দেবেন, তাদের মানসিক পরিশুদ্ধ করবেন, তাদের শরীয়তের হুকুম-আহকাম শিখাবেন। তাছাড়া তাদের ইসলামি সভ্যতা-সংস্কৃতি এমনভাবে শিক্ষা দেবেন যাতে করে তারা গ্রাম ও শহরের যুবতী-বৃদ্ধা নির্বিশেষে সব নারীকে শরীয়তের বিধি-বিধান শিখাতে পারেন। ফলে নারীদের মধ্যে তাবলীগে দ্বীনের দায়িত্ব পূর্ণতা লাভ করবে।

এ কারণেই আমরা লক্ষ্য করি, দাম্পত্য জীবন তথা পারিবারিক জীবনের রীতি-নীতি শিক্ষাদানে উম্মুল মুমিনীন বিরাট ভূমিকা পালন করেছেন। বিশেষত তাদের যারা দীর্ঘায়ু লাভ করেছিলেন তারা এ দায়িত্ব পালনের সুযোগ বেশি পেয়েছিলেন। যেমন আয়েশা সিদ্দিকা (রা.) এর কথা উল্লেখ করা যায়। তিনি নবী (সা.) জীবনের কথা ও কাজ খুব বেশি বর্ণনা করেছেন।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলআইহি ওয়াসাল্লাম এর একটি বিষয়ে জাহেলি যুগের এমন একটি রীতি-নীতি নস্যাৎ করে দিতে অনুষ্ঠিত হয়েছিলো, যা আরব সমাজে পুরুষানুক্রমে চলে আসছিলো। তা হচ্ছে, কাউকে পালকুপত্র হিসেবে গ্রহণ করলে সে আসল পুত্রের মর্যাদা ও অধিকার ভোগ করতো। এ নিয়ম আরব সমাজে এমন দৃঢ়ভাবে প্রোথিত হয়ে বসেছিলো, যা বিলোপ করা মোটেই সহজ ছিলো না। অথচ এ নিয়ম ইসলামের বিয়ে, তালাক, সম্পত্তি আইন এবং অন্যান্য বিষয়ের সঙ্গে ছিলো মারাত্নকভাবে সংঘাতপূর্ণ। এছাড়া জাহেলি যুগের এ কুসংস্কার নিজের মাঝে এমন সব নির্লজ্জ কার্যকলাপ এবং বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করেছিলো, সেসব থেকে সমাজদেহকে মুক্ত করা ইসলামের অন্যতম মৌলিক উদ্দেশ্যের অন্তর্ভূক্ত। জাহেলি যুগের এ কুসংস্কার নির্মূল করার উদ্দেশ্যে স্বয়ং আল্লাহ রাব্বুল আলামিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সঙ্গে হজরত যয়নব বিনতে জাহশের বিয়ে দেন।

উল্লেখ্য, হজরত যয়নব প্রথমে হজরত যায়েদের স্ত্রী ছিলেন, আর যায়েদ (রা.) ছিলেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লল্লাম এর পালকপুত্র। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বনিবনা না হওয়ায় হজরত যায়দ (রা.) স্ত্রীকে তালাক দেয়ার সিদ্ধান্ত নেন। এটা সে সময়ের কথা যখন সব কাফের শক্তি আল্লাহর রাসূলের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ ছিলো। কাফেররা সে সময় খন্দক যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছিলো। এদিকে পালকপুত্র বিষয়ক সমস্যা সমাধানের জন্যে আল্লাহর নির্দেশ ঘোষিত হয়েছে। চলবে…

আপনার মতামত প্রদান করুন
  • 6
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
এ বিভাগের অন্যান্য