ভিন্ন পেশায় পথ দেখাচ্ছেন সুনামগঞ্জের তরুণ আলেমরা


নিউজ ডেস্ক : মাওলানা আবু মুসা সাফওয়ান। সুনামগঞ্জের জয়নগর বাজারে বসবাস করেন। একই জেলার জামিয়া মারকাজুল উলুম থেকে ২০১১ সালে দাওরায়ে হাদিস সম্পন্ন করেন এবং নিজ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দীর্ঘ ৯ বছর শিক্ষকতা করেন। সম্প্রতি তিনি একটি ব্যাবসায়িক প্রতিষ্ঠানের যাত্রা করেছেন—যেখানে গ্রাফিক ডিজাইনের পাশাপাশি টুপি, তাসবিহ, মিসওয়াক ও আতরের মতো সুন্নতসামগ্রী বিক্রি করা হবে। মাওলানা সাফওয়ান মনে করছেন, মাদরাসায় শিক্ষকতার পাশাপাশি ব্যবসা করলে তিনি তাঁর পরিবার ও সমাজে আরো বেশি অবদান রাখতে পারবেন। তাঁর দাবি পরিবারের সদস্য, শিক্ষক ও সহকর্মীরা তাঁর এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন।

মাওলানা আবু মুসা সাফওয়ানের মতো অনেক তরুণ আলেম মাদরাসায় শিক্ষকতার পাশাপাশি সহযোগী পেশায় যুক্ত হচ্ছেন। আবার অনেকেই দ্বিনদারির সঙ্গে সম্পূর্ণ ভিন্ন পেশা বেছে নিচ্ছেন। প্রায় এক দশক ধরে তরুণ আলেমদের ভিন্ন পেশায় যুক্ত হওয়ার প্রবণতা দেখা দিলেও সমকালে তা বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষত করোনাভাইরাসের কারণে বৈশ্বিক যে বিপর্যয় দেখা দিয়েছে, তা তাঁদের ভবিষ্যতের ব্যাপারে শঙ্কিত করে তুলেছে। অনেকেই তাঁদের তিলে তিলে গড়ে তোলা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির অস্তিত্ব রক্ষা ও তা এগিয়ে নেওয়ার পথ দেখছেন না। আবার যাঁরা দীর্ঘদিন ধরে এসব প্রতিষ্ঠানে সেবা দিয়ে এসেছেন তাঁরাও প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে আশানুরূপ সহযোগিতা পাচ্ছেন না। তাই বিকল্প বা সহযোগী পেশা হিসেবে অনেকেই কৃষি, মাছ চাষ, পশুপালন, ছোট ছোট ব্যবসা ইত্যাদির সঙ্গে যুক্ত হচ্ছেন।

বাংলাদেশ কওমি মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডের (বেফাক) সহসভাপতি ও জামিয়া ইসলামিয়া হোসাইনিয়া, গহরপুর, সিলেটের পরিচালক মাওলানা মুসলেহুদ্দীন রাজু বলেন, ‘আলেমদের ভিন্ন পেশা বা কাজ থাকা নতুন কোনো বিষয় নয়। এখন থেকে দুই দশক আগেও দেশের বেশির ভাগ দ্বিনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ‘বোর্ডিং সিস্টেম’ বা আবাসিক থাকার ব্যবস্থা ছিল না। স্থানীয় শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা বাড়ি থেকে পড়ালেখা করতেন এবং শিক্ষকতার পাশাপাশি তাঁরা মসজিদের ইমামতি, কৃষিকাজ ও ব্যবসা করতেন। বাইরের ছাত্র-শিক্ষকদের জন্য ‘লজিং’-এর ব্যবস্থা করা হতো। সেখানেও তাঁদের ভিন্ন ভিন্ন কাজ করতে হতো।’

তিনি মনে করেন, আলেমদের ভিন্ন পেশায় যুক্ত হওয়ার সামাজিক দাবি তৈরি হয়েছে বেশ আগেই। করোনাকালীন সংকট সেই দাবিকে জোরালো করেছে মাত্র।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. আবু সালেহ মুহাম্মদ তোহাও আলেমদের ভিন্ন পেশায় যুক্ত হওয়াকে ইতিবাচকভাবেই দেখছেন। তিনি মনে করেন, ইসলামী শরিয়তের নির্দেশনা, রাষ্ট্রীয় আইন ও সামাজিক দৃষ্টিকোণ বিবেচনা করে আলেমরা যেকোনো পেশায় আত্মনিয়োগ করতে পারেন। এতে আলেমদের জ্ঞানচর্চার স্বাধীনতা ও সামাজিক মর্যাদা দুটিই বৃদ্ধি পাবে। তিনি বলেন, ‘ইসলামী সোনালি যুগের মনীষীদের জীবনী পাঠ করলে দেখা যায় তাঁরা জীবিকা নির্বাহের জন্য শিক্ষকতা ও জ্ঞানচর্চা করতেন না। জীবিকা নির্বাহের জন্য তাঁদের ভিন্ন পেশা ছিল। তাঁদের অনেকেই আগে পেশাগত জ্ঞান অর্জন করার পর ধর্মীয় জ্ঞানচর্চায় আত্মনিয়োগ করেছেন।’

তবে উভয় ইসলামী ব্যক্তিত্ব মনে করেন—নির্বিচারে ও নির্বিশেষে সবার ভিন্ন পেশায় জড়িয়ে যাওয়া উচিত হবে না; বরং একদল মেধাবী ও যোগ্য আলেমের সার্বক্ষণিকভাবে দ্বিনি শিক্ষায় নিয়োজিত থাকা আবশ্যক। নতুবা দ্বিনি শিক্ষার চলমান ধারা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। যেসব আলেম দ্বিনি শিক্ষার জন্য নিজেদের উৎসর্গ করবেন, অন্য আলেম ও সাধারণ মুসলমানের দায়িত্ব হবে তাঁদের প্রতি ও তাঁদের পরিচালিত প্রতিষ্ঠানের প্রতি মনোযোগী থাকা এবং তা রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করা।

তাঁরা এটাও মনে করেন যে, আলেমদের আত্মমর্যাদা ও সামাজিক সম্মানের পরিপন্থী পেশায় যুক্ত হওয়া উচিত নয়। কেননা তাতে তাঁদের সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধির চেয়ে তা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা বেশি।

আপনার মতামত প্রদান করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
এ বিভাগের অন্যান্য